শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চোখের জলে বন্দর মাদরাসার অধ্যক্ষের বিদায় ,তাঁর রচিত গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

0
431

মাহমুদুল হাসান সিরাত ■ 
বন্দর ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল হকের অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে এবং সেই সাথে বহুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল তার স্ব রচিত ইসলামিক গ্রন্থ কাশফুল মুবহাম’র মোড়ক উন্মোচন সহ ইসলামিক ওয়েবসাইট https://baitulilliyeen.com/ বাইতুল ইল্লিয়্যিন ইসলামিক গবেষণা কেন্দ্রে’র শুভ উদ্ভোধন করা হয়।

রবিবার বেলা ১১ টায় মাদরাসার হলরুমে এই বিদায় সংবর্ধনা এবং গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিদায়ী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বন্দর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি , বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়্যারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব এম এ রশিদ এবং প্রধান আলোচক হিসেবে বন্দর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শুক্লা সরকারের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তারা উপস্থিত হতে পারেন নি।

এ দিকে সদ্য বিদায়ী অধ্যক্ষকে শেষ বারের মত মাদরাসায় বিদায় জানানোর জন্য ভালোবাসার টানে করোনাকে উপেক্ষা করে নিরাপদ দুরুত্ব বজায় রেখে স্বত:ফুর্তভাবে অংশগ্রহন করে চোখের জলে এবং হৃদয় নিংরানো ভালোবাসা দিয়ে বিদায় জানান শিক্ষার্থীরা।

এ সময় অনুষ্ঠানে মাদরাসার শিক্ষিকা আশুরা আক্তারের সঞ্চালনায় এবং বন্দর ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসার সভাপতি নাজমুল হাসান আরিফের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন নাসিক ২১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হান্নান সরকার, বন্দর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আরিফুর রহমান।

অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাদরাসার গভর্নিং বডির সদস্য নুর মোহাম্মদ ব্যাংকার , মোঃ শামসুদ্দোহা, নজরুল ইসলাম,মফিজুল ইসলাম, বন্দর ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসার উপাধাক্ষ্য মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, সিকদার আব্দুল মালেক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মাহামুদ আলীসহ শিক্ষক শিক্ষার্থী এবং কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

তাঁর অবসরোত্ত বিদায়ে কৃতিত্বের কথা স্মরণ করে আগত অতিথি,শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চোখেও পানি চলে আসে।

এ সময় দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিচারন করতে গিয়ে বিদায়ী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল হক আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন।

তিনি তাঁর বিদায়ী বক্তব্যে বলেন ‘‘আজ এই বিদায় বেলায় আমার শিক্ষকতা এবং অধ্যক্ষকতার জীবনের দীর্ঘ বছরের হাজারো স্মৃতি হৃদয়ের পর্দায় ভেসে উঠছে। আজ সত্যিই আপনাদের ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ। ইচ্ছে করছে কেদে চোখের জল ভাসিয়ে বিদায়ী কষ্টের যন্ত্রনা লাঘব করার জন্য। কিন্তু আমি যে অধ্যক্ষ! আমার চোখের জল মানায় না। একজন অধ্যক্ষের নানামুখি সীমাবদ্ধতা এবং দায়বদ্ধতা আছে। এরই মধ্যে একজন অধ্যক্ষকে আগাতে হয়, কেননা পুরো প্রতিষ্ঠানের ভালোমন্দর দেখভাল করা একজন অধ্যক্ষের গুরু দায়িত্ব।
আমরা মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ইতিবাচকভাবে বদলে যেতে দেখেছি।আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের প্লাটপর্ম তৈরী করে দিয়েছি। মাদরাসায় পড়েও ওরা পিছিয়ে নেই। আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের আন্তরিকতা, আরবীর পাশাপাশি ইংরেজী এবং প্রযুক্তিতেও আগানোর চেষ্টা করেছি। করোনা মহামারীতেই আমাদের ছেলেরা অনলাইন জুমে ক্লাস করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে থাকেন আমি পারি, আমরা পারি। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তার নেতৃত্বে পদ্মা সেতু নির্মান হচ্ছে। আমি বর্তমান উপাধাক্ষ্য যে আমি যাবার পর ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে তাকে উদ্দেশ্য করে বলতে চাই আমাদের প্রতিষ্ঠান প্রধানদের অনেক দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতা আছে, এর মধ্যেই কাজ করে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি আরো বলেছেন দায়িত্ব নেওয়ার পরথেকে ন্যায় ও নিষ্ঠার সাথে তিলতিল করে গড়ে তুলেছি প্রতিষ্ঠানটিকে।
আমার স্বপ্ন ছিলো এই মাদরাসা দেশের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে রুপান্তরিত হবে। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাথীরা দেশের কল্যান , দেশের মানুষের কল্যানে কাজ করবে।
একজন ছাত্রকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই একজন শিক্ষকের জন্য পরম পাওয়া। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আমি নিজের সন্তানের মত দেখেছি। মাদরাসাকে মায়ের মত মনে করেছি।

আমার পরিবারে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি,একমাত্র ছেলে দেশের বাইরে থাকে। তাই আমার সন্তান মাদরাসার সব ছেলেমেয়েরা। বাসায় আমি আর স্ত্রী থাকতাম। স্ত্রী মারা যাওয়ায় মাদরাসাটি আমার পরিবার হয়ে উঠেছিলো।
স্ত্রী মারা যাওয়ার দিনও আলিম পরীক্ষা চলায় প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং কেন্দ্রে সচিবের দায়িত্ব যথাযথ পালনের লক্ষে
আমি দায়িত্ব পালন করেছি। মারা যাওয়ার পরের দিনও কোন ছুটি না নিয়ে মাদরাসায় এসেছি। কেননা বাসায় যে ছিল সে আর নেই তাই মাদরাসায় ছুটে আসতাম। আমার স্ত্রীর প্রেরনায় আজ আমি ইসলামিক গ্রন্থ কাশফুল মুবহাম এবং ইসলামিক ওয়েবসাইট বাইতুল ইল্লিয়্যিন গবেষনা কেন্দ্রর ওয়েবসাইট করতে সক্ষম হয়েছে। মহান আল্লাহর নিকট শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। আমার স্ত্রী মরহুমা তাসলিমার নামে উৎসর্গ করছি।

একজন ছাত্রকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই একজন শিক্ষকের পরম পাওনা। বিদায় ক্ষনে আমি শিক্ষাথী এবং শিক্ষক কর্মচারীদের ভালোবাসায় অভিভুত । আজকের পর থেকে আর আমি আর ইচ্ছা থাকা সত্বেও আর প্রতিষ্ঠানে আসতে পারবো না।প্রতিষ্ঠানটি ছিল আমার পরিবার। এই পরিবার রেখে আমার খুব কষ্ট হবে।
কলেজের শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের যেমন শাসন করেছি তেমনি অন্তর থেকে ভালোবেসেছি। তাদের সাথে আমার যে বন্ধন তা কখনো ছিড়বে না।এরমধ্য দিয়েই মাদরাসায় অন্য রকম পরিবেশ তৈরী হয়েছে।আমি বিশ্বাস করি আমি চলে গেলেও মাদরাসার এ রকম এর চেয়েও বেশী উন্নয়ন ও পড়াশোনার মানের পরিবেশ অব্যাহত থাকবে। বন্দর ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসা আমার প্রান’’।

জানা গেছে,সোনারগাও’র কৃতি সন্তান মুহাম্মদ নুরুল হক নারায়ণগঞ্জ সদর এবং মুন্সিগঞ্জের আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ থেকে রুপগঞ্জের কালাদি ফাযিল মাদরাসায় উপাধাক্ষের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তার পর পদন্নতি পেয়ে গাজীপুরের বন্দান ফাযিল মাদরাসা ,মিরসরাই চট্রগ্রামের জামেয়া ফাযিল মাদরাসা থেকে এসে নারায়ণগঞ্জের বন্দর ইসলামিয়া ফাযিল মাদরাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দীর্ঘ বছর কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২৮ ফ্রেবুয়ারী ছিল তার শেষ কর্ম দিবস এবং তার বিদায় সংবর্ধনা।

পরে ক্রেন্ট, সংবর্ধনা ও ফুলেল শ্রদ্ধায় বিদায় জানানো হয়। পরিশেষে মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। দোয়া পরিচালনা করেন সদ্য বিদায়ী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ নুরুল হক।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here