শাহজাদপুরে একযুগ হলো প্রতিবন্ধী আলামিন শিকলেবন্দী

0
79

জহরুল ইসলাম, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি ঃ কিশোর আলামিনের বয়স এখন ১৭ বছর। এ বয়সে আর-দশজন শিশুর মতোন স্কুল যাওয়া, বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা, নদীতে সাতার কাটা যার কোনটাই সম্ভবনা আলামিনের। জন্ম থেকেই মানসিক প্রতিবন্ধী। দরিদ্র পিতা হোটেল শ্রমিক শহিদুলের জন্য বিরাট পাহারের মত বোঝা হলেও পিতার ¯েœহের কমতি নেই তার প্রতি। অন্যের বাড়ী ঝিয়ের কাজ করা মা রেখা খাতুন তার বুকচেড়া ধন আলামিনকে মুক্ত রেখে জীবিকার অন্বেষনে যাওয়া দুষ্কর। আলামিনকে মুক্ত রেখে মা কর্মস্থলে গেলে বেশ কয়েকবারই পথ ভূলে হারিয়ে যায় সে। তাই বাধ্য হয়েই পিতা-মাতা উভয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার আগে শিকলেবন্দী করে রেখে যান আলামিনকে। কারন একদিন কর্মস্থলে না গেলে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় উচ্চ মূল্যের এই বাজারে।

যমুনার ভাঙনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ার পর অসহায় শহিদুল পরিবার নিয়ে চলে আসেন শাহজাদপুরে নানা শ্বশুরের বাড়ীতে। সেখানেও স্থান সংকুলন না হওয়ায় উপজেলার পৌর শহরের শান্তিপুর গ্রামে একটি জায়গা মাসিক পাঁচশত টাকা চুক্তিতে ভাড়া নিয়ে ছোট্ট একটি টিনের চালা ঘড় তুলে বসবাস করছেন দীর্ঘ সময় ধরে। পাঁচশত টাকার চুক্তিতে কোন রকম মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেও দুমুঠো ভাতের জন্য আলামিনের পিতামাতা দুজনকেই ছুটতে হয় কাজের জন্য। সকালে কাজে বের হয়ে বাড়ি ফেরেন রাতে। সারাদিন প্রতিবন্ধী আলামিনকে বাড়িতে একাই থাকতে হয়। যেহেতু আলামিন মানসিক প্রতিবন্ধী। তাই পিতামাতা সবসময় শংকায় থাকেন আলিমিনকে হারানোর। এই শংকা দূর করতেই অসহায় পিতামাতা নিরাপত্তার জন্য আলামিনের পায়ে শিকল বেধে তালা লাগিয়ে গাছের সাথে বেধে রেখে কাজে বের হন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি টিনের চালা ঘড়। পাশেই একটি গাছের সাথে আলামিনের পায়ে শিকল লাগিয়ে তালাবদ্ধ করে রেখে কর্মস্থলে গেছে তার বাবা-মা। ঝড়বৃষ্টি যা-ই হোক, সারা দিন কাজ করে বাড়িতে মা-বাবা না ফেরা পর্যন্ত আলামিনকে শিকলবন্দী হয়ে গাছের পাশেই থাকতে হয়। শত চিৎকার করেও মুক্তি মেলেনা তার। এটা যেন চারপাশের সবারই গা সওয়া ব্যাপার হয়ে গেছে। পড়ন্ত বিকেলে মা বাড়ি ফিরে শিকলের তালা খুলে ১৭ বছর বয়সী মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে গোসল করান।

এভাবেই দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলে আসছে আলামিনের এই শিকলবন্দী জীবন। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা সদরের শান্তিপুর গ্রাম। সেখানেই নদী তীরে ছোট্ট একটি ভাঙাচোরা ঘরে থাকেন আলামিন ও তার মা বাবা ।
কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় একটি খাবার হোটেলে কাজ করেন আলামিনের বাবা শহিদুল এবং মা অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। আলামিনের জন্মের পরেই তার পিতা বেলকুচি নিবাসি শহিদুলের ভিটে-মাটি যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নিরুপায় আলামিনের পিতামাতা ছোট্ট শিশুকে নিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় হলো বসবাস করছেন শাহজাদপুরে।

একমাত্র ছেলে আলামিন স্বাভাবিকভাবে বেড়ে না ওঠায় তাকে নিয়ে পড়েন মহা বিপাকে। নিজে নিজে কোন কিছু করার ক্ষমতা নেই আলামিনের। মাঝে মাঝে শরীর থেকে জামাকাপড় খুলে ফেলে দেয়। সুযোগ পেলেই দৌড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে শিকলবন্দী করে রাখে তাকে। অর্থাভাবে মা বাবা ছেলেকে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে পারেননি শিশুকাল থেকেই। স্থানীয় বিভিন্ন কবিরাজ ও তাবিজ-কবজের চিকিৎসা করিয়েছেন কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।

আলামিনের মায়ের ভাষ্য, প্রতিদিন সকালে প্র¯্রাব-পায়খানা পরিষ্কার করে ছেলের পায়ে শিকল পরান। এরপর নিজেদের জন্য রান্না করে ছেলেকে খাওয়ানোর পর নিজে খেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে কাজে বেরিয়ে পড়েন। সারা দিন ছেলেটি না খেয়ে শিকলবন্দী হয়ে থাকেন। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে ছেলেকে পরিষ্কার করে গোসল করান। এরপর নিজেও গোসল করেন। রান্নাবান্না করে মা-ছেলে খেয়ে শুয়ে পড়েন। ছয়সাত বছর বয়স থেকেই তাঁকে এভাবে বেঁধে রাখতে হয়।

গতকাল দুপুরে বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, আম গাছের নিচে একটি শিকল লাগিয়ে আলামিনকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এ সময় লোকজন দেখে আলামিন অদ্ভূত শব্দ করছিল।
এ সময় কথা হয় আলামিনের মায়ের সাথে। তিনি জানান, ‘এই ছেলেকে ১৭ বছর ধইরা টানত্যাছি। এহন ছেলের সাথে আর পারি না। কিন্তু ছাইড়াও রাখতে পারি না। কহন কই যায়, নাকি কোনো পুকুরেই পড়ে। তাই মা হয়া নিজেই ছেলের পায়ে শিকল পরাই বাইন্ধা রাহি। ছেলের কষ্ট দেইখা কইলজাটা ছিঁইড়া যায়। কী করমু কোনো তো উপায় নাই।’

ছেলের একটা প্রতিবন্ধী কার্ড পেতে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিদের কাছে যেতে হয়েছে বহুবার। কিন্তু কোন চেষ্টাতেই একটি কার্ড মেলেনি আলামিনের ভাগ্যে। একটি প্রতিবন্ধী কার্ড পেলে সামান্য হলেও উপকারে আসতো আলামিনের দরিদ্র পরিবারের। কিন্তু নানা জায়গায় ধন্না দিয়েও কার্ড না পেয়ে হতাশায় সে আশাও ছেঁড়ে দিয়েছেন আলামিনের পরিবার। ইতি পূর্বে চাইল্ড সাইড কেয়ার ফাউন্ডেশন থেকে মাসিক ৩’শ টাকা দিলেও অফিসার বদলে যাওয়ায় নাকি এখন আর সে সেই অনুদান আর পায়না।

এ ব্যাপারে শাহজাদপুর পৌরসভার স্থানীয় কাউন্সিলর লিয়াকত আলী জানান, কিছু সরকারি নিয়ম রয়েছে যা পালনের জন্য ওই প্রতিবন্ধী মা-বাবাকে বলা হলেও তা তারা এখনো করতে না পারায় আমি আলামিনকে প্রতিবন্ধী কার্ড দিতে পারছিনা।#

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here